করোনা: আসুন আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হই

নজরুল ইসলাম জুলু: সারা বিশ্ব বর্তমানে ‘করোনাভাইরাস’ আতঙ্কে ভীতসন্ত্রস্ত। এখন সকল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুই হচ্ছে প্রাণঘাতী এই ভাইরাস। মানুষকে সচেতন করতে চারিদিকে যেমন প্রচারণা চলছে। তেমনি তেমনি করোনা নিয়ে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্যও কম ছড়াচ্ছে না। এ অবস্থায় আমজনতা ঠিক কী করবেন, কোনটা করবেন- আর কোনটা করবেন না তা ঠাওর করে উঠতে পারছেন না! করোনাভাইরাস নিয়ে একেক জন যেন বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছেন।

তাই এই প্রসঙ্গে কিছু লিখে আর থাকা গেলো না। এই মহামারী সম্পর্কে আমার মনের কোণে জমে থাকা কিছু কথা সবার সাথে আজ শেয়ার করতে চাই। COVID-19এ এই পর্যন্ত কতজন মারা গেছেন, কতজন আক্রান্ত হয়েছেন, কতজনের অবস্থা আশংকাজনক, মৃত্যুর হার কত, কোন দেশের অবস্থা করুণ, কোন দেশকে লকডাউন করা হলো, এইসব নিয়ে আমি কিছু লিখবো না।কারণ সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে আমরা এইসব তথ্য নিয়মিত পাচ্ছি এবং জানছি। সর্বত্র দিনরাত শুধু করোনভাইরাস সংবাদ! কেনই বা হবে না এমন বিপর্যয়ের সম্মুখীন বিশ্ব খুব কমই হয়েছে।

ভাইরাসটি নিয়ে ভয়ের অন্যতম কারণ এর কোনো ভ্যাক্সিন এখন পর্যন্ত আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি, তবে বিশ্বের গবেষকরা গবেষণা করছেন। ইনশাআল্লাহ শিগগিরই আমরা ভালো কোন খবর জানতে পারবো। এই ভাইরাসটি নিয়ে উদ্বেগের কারণ একটাই; তা হচ্ছে এতে মৃত্যুর হার খুবই কম হলেও সংক্রমণের হার বেশি। ফলে মানুষ দ্রুত আক্রান্ত হচ্ছে। আর যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, যাদের বয়স বেশি যারা আগে থেকেই হার্ট, উচ্চরক্তচাপ, কিডনি, লিভার ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন জটিল সমস্যায় ভুগছেন তারা আক্রান্ত হলে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় চলে যাচ্ছেন।

এই মহূর্তে ভাইরাসটি থেকে থেকে বেঁচে থাকার অন্যতম উপায় হলো পরিচ্ছন্নতা। বেশি বেশি হাত ধোঁয়া, হাচি-কাশির শিষ্টাচার মেনে চলা। অপ্রয়োজনে বাড়ি থেকে না বের হওয়া অর্থাৎ অনেক বেশি সতর্ক থাকা। সচেতনতা ও সতর্কতাই একমাত্র প্রতিরোধের উপাই। এখন প্রশ্ন হলো এই যে COVID-19 নিয়ে এত্ত কথা, আলাপ আলোচনা, প্রতিবেদন এইসব কী পেরেছে আমাদের কে সচেতন করতে? আমরা কী সচেতন হয়েছি?

ব্যক্তিগতভাবে আমার মতামত হলো আমরা যতটা না সচেতন হয়েছি বা সচেতন করতে পারছি তারচেয়েও বেশি আতংক সৃষ্টি করছি। আমি এইটা বলছি না যে, এই ভাইরাস নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। আমাদেরকে অবশ্যই এই রোগটি থেকে ভয় পেতে হবে। তবে ভয়ের চেয়ে বেশি সচেতন হতে হবে। প্রতিদিন করোনা নিয়ে যে খবরগুলো পড়ি বা দেখি তাতে ইতিবাচক খবর কম আর নেতিবাচক খবরই বেশি দেখতে পাই। COVID-19 সারাবিশ্বে অবশ্যই ত্রাস তৈরি করেছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে ভাইরাসে আক্রান্ত হলে আর মুক্তি মিলবে না নিশ্চিত মৃত্যু হবে। আমি মনে করি এ ধরনের চিন্তা আমাদের মাথা থেকে যতক্ষণ না বের হবে, ততদিন আমরা এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারবো না।

যথাযথ সাবধানতা ও সুস্থ জীবনযাপনের নিয়মগুলো অনুসরণ করে চললে ইনশাআল্লাহ এই ভাইরাস থেকে আরোগ্য সম্ভব। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর অনেকে সুস্থও হয়েছেন। কিন্তু সেভাবে তার প্রচার নেই। কত মানুষ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন তার প্রচারও কম। তাদের কথা বিদেশি গণমাধ্যমগুলোতে প্রচার হলে সেখান থেকে মানুষ কিছুটা হলেও শক্তি ও সাহস সঞ্চার করতে পারতো। চারিদিকে নেতিবাচক খবর দেখতে দেখতে জনসাধারণের মনে আতংক দানা বেঁধেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ভাইরাসটিকে নিয়ে নানান রকম অবান্তর খবর যেমন- এইটি ২৩°এর বেশি তাপমাত্রায় টিকে থাকতে পারে না, এইটি শুধু মাত্র বয়ষ্কদের গ্রাস করছে, মুসলমানদের এই রোগ হবে না, গোমূত্র পানে বা থানকুনি পাতা খেলে এইরোগ থেকে আরোগ্য পাওয়া যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

অনেকেই আবার ডাক্তারি করে ফেসবুক লাইভে এসে নানান রকম তথ্য আর পরামর্শ দিচ্ছেন। আচ্ছা, তাদের দেওয়া তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য তা কী কেউ ভেবে দেখেছি? কোন ফেসবুক সেলেব্রিটি করোনা নিয়ে কিছু বললেই তা মুহূর্তেই ভাইরাল করে দিচ্ছি। একবার কী ভেবেছি, যে তথ্যটা ভাইরাল করছি তা কতটুকু নির্ভরযোগ্য? এইভাবে কী আমরা সবাইকে সচেতন করছি নাকি জনমনে তথা সমাজে আতঙ্ক সৃষ্টি করছি? আমরা সচেতন বা দায়িত্বশীল তো হতে পারিনি বরং আতঙ্ক আর অজ্ঞতার জন্য অন্যদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছি। বিদেশফেরতরা দিব্যি যত্রতত্র বিচরণ করছে৷ সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোবন্ধ করলো কিন্তু আমরা কী করলাম? পরিবার নিয়ে ছুটে গেলাম কক্সবাজার, পতেঙ্গা বেড়াতে! অনেকেই সর্দিকাশি নিয়ে সাবধানতা অবলম্বন না করে বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

আমরা কী নিজে থেকে সচেতন হবো না? কিছু চেষ্টা করবো না? বিশেষজ্ঞরা যা যা করতে বারণ করছে আমরা তাই করছি। আতঙ্কিত হচ্ছি সচেতন হচ্ছিনা! আতঙ্কিত হয়ে বেশি বেশি ভোগ্যপণ্য ক্র‍য় করছি। কখন সমগ্র দেশ লকডাউন করে দিবে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়ে যাবে এই ভয়ে বেশি বেশি পণ্য ক্রয় করে চাহিদা বাড়িয়ে দিচ্ছি এর ফলে গত কয়েকদিনে অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করেছে। একবার কী ভেবে দেখেছি এই যে আমাদের বাড়াবাড়ির জন্য দাম বাড়ছে, যারা দিনমজুর তাদের কি অবস্থা হবে? আতঙ্ক এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে সামান্য সর্দি-জ্বরকেও অনেকে করোনা ভাবছে। আমরা অনেকেই সারাক্ষণ এই নিয়ে দুশচিন্তা করছি কখন না জানি করোনাভাইরাস আমাকে ধরে!

তাই আমাদের সংবাদমাধ্যমগুলোকে আরও অনেক দ্বায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। করোনাভাইরাস নিয়ে শুধু নেতিবাচক নয় বরং ইতিবাচক খবরগুলোকেও সবার সামনে তুলে ধরতে হবে। জনগণকে বোঝাতে হবে আতঙ্কিত নয় বরং সচেতন হতে হবে এবং অন্যকেও সচেতন করতে হবে। জনগণকে বোঝাতে হবে প্রথমে মাথা ঠান্ডা করতে হবে, সংক্রমণ মানেই এই রোগে এক ঘরে হয়ে মরে যেতে হবে, এমন টা নয়।

আমাদের সচেতন থাকতে হবে। বিশেষজ্ঞরা যে নিয়মকানুন গুলো মেনে চলতে বলছেন তা মেনে চলতে হবে। টেনশন করা যাবে না। কারণ টেনশনে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যারা সুস্থ সুন্দর জীবনযাপন করছে, সোশ্যাল ডিসট্যান্স মেনে চলছে, যারা অন্যকোনো রোগে আক্রান্ত নন, যারা ধূমপায়ী নন, যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো তাদের এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কম।

এই বিষয়গুলো আমাদেরকে জনগণের সামনে বেশি বেশি তুলে ধরতে হবে। যারা ফেসবুক সেলিব্রিটি এবং সংবাদমাধ্যমগুলোর উচিত জনগণকে রোগ প্রতিরোধমূলক খাবর যেমন- ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, মিনারেল ও ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার বেশি বেশি খাওয়ার পরামর্শ নিয়মিতভাবে দেওয়া। কারণ করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করার জন্য প্রয়োজন রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, সতর্কতা, ধর্মীয় অনুশাসন, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে চললে আমরা ইনশাআল্লাহ এই অবস্থা থেকে উত্তরণ করতে পারবো। সবার উদ্দেশ্য বলতে চাই COVID-19 নিয়ে ইতিবাচক খবরগুলোও বেশি বেশি প্রচার করুন, বেশি বেশি পণ্য মজুতে নিরুৎসাহিত করুন, সবাইকে সাবধান ও সতর্ক থাকতে বলুন। এই সময়টা অনেক গুরুত্বপূর্ণ তাই যথাসম্ভব সোশ্যাল ডিস্টেন্স মেনে চলুন, লকডাউন করার মতো পরিস্থিতি যেন তৈরি না হয় এই জন্য করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে করনীয় সবকিছু নিজে করতে হবে এবং অন্যকে করতে উৎসাহিত করতে হবে। নিজ নিজ অবস্থান থেকে একে অপরকে এবং সরকারকে সাহায্য করতে হব৷ এছাড়া সর্বাগ্রে সৃষ্টিকর্তার ওপর বিশ্বাস ও আস্থা রাখতে হবে। তিনি ছাড়া আমাদের এ সঙ্কট থেকে উত্তরণের কোনো উপাই নেই।

আরও খবরঃ

Leave a Comment