করোনা

লেখক-ইলিয়াস আরাফাত : রিপোর্টটা হাতে আসতেই অন্য রকম হয়ে গেল পরিবেশটা। কেমন যেন গুমটে আর ভুতুড়ে পরিবেশ। রাকিবের কাছ থেকে একে একে সবাই যেন সরে পড়লো। যে কয়েকজন বা দুর থেকে দেখছে তাদের চোখেমুখে আতঙ্কের ছটা। জলভরা চোখে রাকিবের বেডের পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার বাবা রাহাত চৌধুরী। করোনা ভাইরাস ধরা পড়েছে রাকিবের শরীরে।
চোখের পানি মুছে ছেলের দিকে তাকায়। রাকিবের চোখে ভয়। দীর্ঘদিন ধরে টিভি আর পত্রিকার সংবাদে করোনা যে বিস্তার ভয় ধরিয়েছে তার কিছুটা প্রভাব পড়েছে রাকিবের মনেও।
বাবা আমি কি বাঁচবো না? রাকিবের করুন আকুতি।
রাহাত চৌধুরী চোখের জল মুছে তাকায় ছেলের দিকে। কে বলেছে তুই বাঁচবি না? কিচ্ছু হবে না বাবা তোর।
রাকিব ভয়াতু চোখে তাকিয়ে, তুমি মিছে কথা বলছো বাবা।
ছেলের মাথায় হাত বুলায় রাহাত চৌধুরী, না বাবা আমি মিছে বলিনি।
খবরে যে বলে এ অসুখ হলে মানুষ বাঁচে না। নামে
ওসব ভুল কথা মাথায় আনতে হবে না বাবা। দেখবি তুই ঠিক ভালো হয়ে যাবি।
দুরে দাঁড়িয়ে থাকা সেবিকার কথায় আলোচনায় ছেদ পড়ে। হাত পনেরো দুরে দাঁড়িয়ে সেবিকা বলে, আপনার ছেলে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। এ হাসপাতালে এ রোগি রাখা যাবে না।
অসহায়ের মতো সেবিকার দিকে তাকায় রাহাত চৌধুরী। মুখ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছে না।
সেবিকা আবার বলে ওঠে, আমার কথা বুঝতে পারছেন না? ছেলেকে নিয়ে তাড়াতাড়ি হাসপাতাল ছাড়ুন।
কোথায় যাবো অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে?
করোনার চিকিৎসা হয় এমন কোন হাসপাতালে যান যতো দ্রুত পারেন।
রিপোর্টটা পাওয়ার পর রাহাত চৌধুরী মনের ভেতর থেকে ভেঙে পড়েছে। সেবিকার এমন কথায় মাত্রাটা আরো বাড়ে।
আমাকে একটু সাহায্য করতে পারবেন? সেবিকার উদ্দেশ্যে রাহাত চৌধুরী বলে।
কি সাহায্য বলুন তো?
কাউকে ডেকে দিতে পারবেন যে আমাকে হাসপাতালের বাইরে যেতে সহযোগিতা করতে পারে।
এমন কাউকে পাবেন না। দেখছেন না আপনার ছেলের অসুখের কথা শুনে সবাই পালিয়েছে।
বড় একা মনে হয় রাহাত চৌধুরীকে। এমন সময় ভিষন কান্না পাাচ্ছে তার। ছেলের দিকে তাকায় রাহাত চৌধুরী। ভীতু চোখ দুটো তার দিকে তাকিয়ে আছে। যেন ছিঁটেফোঁটা সাহস খোঁজার চেষ্টা।
রাহাত চৌধুরী মুখে হাসি আনার চেষ্টা করে। কি বাবা ভয় লাগছে?
রাকিব উপর নিচ মাথা নাড়ে। রাহাত চৌধুরী ছেলের মাথায় হাত বুলায়। ধুর পাগল ভয় কিসের? বাবা আছে না?
বাবার মুখে কথাটা শুনে বারো বছরের রাকিবের মুখে ফুটে উঠলো মৃদু হাসি। রাহাত চৌধুরী জিনিসপত্রগুলো ব্যাগে গুছিয়ে নেয়। এর ফাঁকে কয়েকজন ওয়ার্ড বয়কে অনুরোধ করে তাদের হাসপাতালের বাহিরে রেখে আসার জন্য। রাজি তো দুরের কথা কাছে পর্যন্ত কেউ আসলো না। কোন উপায় না পেয়ে ঘাড়ে ব্যাগ আর রাকিবকে কোলে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে পড়ে।
লকডাউনের জন্য রাস্তা প্রায় ফাঁকা বললেই চলে। যে কয়েকটা রিকশা হাসপাতালের গেটে দাঁড়িয়ে ছিলো তারাও যেতে রাজি হয়নি। রাহাত চৌধুরী হাসপাতালের গেটের পাশে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে। না কেউ তাদের চায় না নিয়ে যেতে। করোনা হাসপাতালের নাম শুনলেই সবাই যেন লাফিয়ে সরে যাচ্ছে।
রাকিবের মাথায় হাত রাখে রাহাত চৌধুরী। জ্বরটা বেড়েছে বেশ। বাবার বুকে মাথা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রাকিব ক্লান্ত বেশ। ক্ষীণ কন্ঠে বলে, বাবা এখন কিভাবে যাবো?
ছেলেকে জড়িয়ে ধরে রাহাত চৌধুরী। চিন্তা কিসের? তোর বাবা আছে না।
রাহাত চৌধুরী আবার ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে হাঁটতে শুরু করলো।
হাসপাতালের বেডে রাকিব শুয়ে আছে। দুই মাইল পথ হেঁটে ছেলেকে কোলে নিয়ে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসা দেয়া হাসপাতালে এসেছে রাহাত চৌধুরী। শিশু বলে রাকিবের পাশে থাকার অনুমতি মিলেছে। ছেলের সংস্পর্শে ছিল বলে তারও হাসপাতাল ছাড়তে মানা।
অল্প দুরে বিছানার ময়লা চাদর দিয়ে জড়ানো একটা মৃতদেহ। খানিক পর পর নিরাপত্তা পোশাক পরা একজন এসে জীবাণুনাশক ছিটিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। সেই ফাঁকে দুর থেকে লাশটি দ্যাখতে পায় রাহাত চৌধুরী।বেশ বয়স্ক মানুষ। আশির ঘরের কাছাকাছি বয়স।
অল্প দুরে দাঁড়িয়ে এক সেবিকা। তার কাছ থেকে রাহাত চৌধুরী জানতে পারে। লাশ হয়ে পড়ে থাকা লোকটির ছয়টা ছেলেমেয়ে। লোকটা করোনায় মারা গেছে তাই সবাই পালিয়েছে। লাশ কেউ নিবে না।
ক্লান্ত শরীর। তবু ঘুম নেই চোখে রাহাত চৌধুরীর। একবার ছেলের দিকে আর একবার নিথর পড়ে থাকা লোকটার দিকে তাকায়। হিসেব যেন কিছুতেই মিলছে না।

আরও খবরঃ

Leave a Comment